জাতীয়তাবাদ বলতে কি বুঝায়
জাতীয়তাবাদ বলতে কি বুঝায় : জাতীয়তাবাদ বলতে সাধারণত এমন একটি ধারণা বা মতবাদকে বোঝায় যা একটি জাতির সংহতি, ঐক্য এবং স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। এটি একটি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মতবাদ যা একটি জাতির মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির বোধ জাগিয়ে তোলে এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
### জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা ও উত্পত্তি
জাতীয়তাবাদ শব্দটি ইংরেজি ভাষায় 'Nationalism' থেকে উদ্ভূত হয়েছে। 'Nation' শব্দের উৎপত্তি ল্যাটিন 'Natio' থেকে, যার অর্থ জন্ম বা উৎস। 'Nationalism' শব্দটি ব্যবহার শুরু হয় ১৮শ শতাব্দীতে, যখন ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটে। জাতীয়তাবাদ প্রথমে ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তাধারায় প্রভাব ফেললেও, পরবর্তীতে তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন জাতির রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে।
জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হল জাতি। জাতি বলতে এমন একটি গোষ্ঠীকে বোঝায় যা একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত। জাতি একটি সামাজিক গোষ্ঠী হলেও, এর মধ্যে শক্তিশালী একীকরণ শক্তি থাকে যা তার সদস্যদের মধ্যে একতা ও সংহতির বোধ সৃষ্টি করে। এই একতা ও সংহতির বোধই জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি।
### জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্ট্য
জাতীয়তাবাদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো:
1. **জাতীয় সংহতি**: জাতীয়তাবাদ জাতির মানুষের মধ্যে সংহতি ও ঐক্যের বোধ সৃষ্টি করে। এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ভাষাগত বৈচিত্র্যকে মেনে নিয়ে একত্রিত হওয়ার প্রেরণা জোগায়।
2. **স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব**: জাতীয়তাবাদ জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি জোর দেয়। এটি একটি জাতির নিজস্ব রাষ্ট্রের অধিকারকে গুরুত্ব দেয় এবং বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রেরণা দেয়।
3. **জাতীয় স্বার্থ**: জাতীয়তাবাদ একটি জাতির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। এটি জাতির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে এবং জাতীয় স্বার্থে কোন ক্ষতি না হয় তা নিশ্চিত করে।
4. **আত্মপরিচয়**: জাতীয়তাবাদ একটি জাতির মানুষের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় তৈরি করে। এটি জাতির সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যের প্রতি গর্ববোধ সৃষ্টি করে।
5. **একীকরণ শক্তি**: জাতীয়তাবাদ একটি একীকরণ শক্তি হিসেবে কাজ করে। এটি জাতির বিভিন্ন অংশের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি তৈরি করে এবং একটি সমন্বিত জাতি গঠনের প্রচেষ্টা করে।
### জাতীয়তাবাদের প্রকারভেদ
জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হল:
1. **সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ**: এই জাতীয়তাবাদ একটি জাতির ভাষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত, ধর্ম ও সামাজিক রীতিনীতির প্রতি গুরুত্ব দেয়। এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও উন্নয়নের প্রেরণা জোগায়।
2. **রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ**: এই জাতীয়তাবাদ একটি জাতির নিজস্ব রাষ্ট্রের অধিকারকে জোর দেয় এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতি গুরুত্ব দেয়। এটি বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে।
3. **অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ**: এই জাতীয়তাবাদ একটি জাতির অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। এটি জাতীয় সম্পদ ও সম্পত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করে এবং বিদেশী অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার প্রেরণা জোগায়।
4. **ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ**: এই জাতীয়তাবাদ একটি জাতির ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের প্রতি গুরুত্ব দেয়। এটি একটি জাতির ধর্মীয় সংহতি ও ঐক্যের উপর জোর দেয়।
### জাতীয়তাবাদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক
জাতীয়তাবাদ অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে, যেমন এটি জাতীয় সংহতি ও ঐক্য সৃষ্টি করে, জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে গুরুত্ব দেয় এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে, জাতীয়তাবাদের নেতিবাচক দিকও রয়েছে, যেমন এটি জাতিগত বিদ্বেষ ও শত্রুতার জন্ম দিতে পারে, জাতীয় স্বার্থের নামে অন্য জাতির উপর অত্যাচার ও শোষণের প্রেরণা জোগাতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
### উপসংহার
জাতীয়তাবাদ একটি শক্তিশালী মতবাদ যা জাতির মানুষের মধ্যে সংহতি ও ঐক্য সৃষ্টি করে এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে, জাতীয়তাবাদকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে যাতে এটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনে এবং মানবজাতির সামগ্রিক কল্যাণে কাজ করে।
আরও পড়ুন >>> নৈতিকতা বলতে কি বুঝায়